সাধারণত শারীরিক ও মানসিক বিকার বা সমস্যা গ্রস্থ মানুষকে প্রতিবন্ধী বলা হয়। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এমন যে আমরা এসব প্রতিবন্ধী মানুষদের একটু আলাদা করে দেখি। তাদেরকে সমাজের বোঝা মনে করি। তাদেরকে একটু ভালোবাসার দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা কৃপনতা দেখাই। আমরা তাদের ভাবি অচল পয়সা। শুধু তাই নয় প্রতিবন্ধী শিশুর পিতা-মাতা তাদের সন্তান কে নিয়ে কুন্ঠিত থাকেন। তারা মনে করেন এই সন্তান তাদের জন্য অভিশাপ। কিন্তু সবাই সমান নন। ব্যতিক্রমী মানুষও আছেন। তাদের জীবন দর্শনটাই আলাদা। সমাজের সাধারণ মানুষের দৃষ্টি যেখানে শেষে, তাদের দেখাটা সেখান থেকেই শুরু। তারা যেন সমাজের আয়না সরুপ। সমাজের প্রচলিত তথাকথিত নিয়ম গুলোকে ভেঙে দেওয়ার জন্য তাদের জন্ম। আর এরকম মহান হৃদয়ের মানুষদের পক্ষে একমাত্র এইসব পঙ্গু অসহায় মানুষের কথা ভাবা সম্ভব। আর এমনি দুই জন মানুষ রাজশাহীর জনাব আব্দুল করিম সাহেব ও তাঁর ছেলে জনাব আব্দুল মজিদ সাহেব। তারা মহৎ প্রাণ, কারণ তারা প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য নির্মান করেছেন সাধনপুর পঙ্গু শিশু নিকেতন। এই শিশু নিকেতনের শিশুদের মুখে হাসি ফুটেছে, তারা জীবনে বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে পেয়েছে। এখানে শিশুরা মৌলিক অধীকার ভোগ করার সুযোগ পাচ্ছে, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এভাবে তারা সমাজের যোগ্য ব্যক্তি হিসাবে গড়ে উঠতে পারবে।

 

সৃষ্টির ইতিহাস: জনাব মরহুম আব্দুল করিম সাহেব ১৯৭৯ সালে বারনই নদীর তীরে সাধনপুর পঙ্গুশিশুনিকেতনটি প্রতিষ্ঠা করেন। “একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি”- গানটি মুক্তযুদ্ধের সময় ঠিক যেভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল, উৎসাহ দিয়েছিল ঠিক তেমনি গানের এই মর্ম স্পর্শী লাইনটি ছিল জনাব আব্দুল করীম সাহেবের এই প্রতিষ্ঠান তৈরির পেছনকার মূলমন্ত্র বা প্রেরণা। মূলত প্রতিবন্ধীদের চিকিৎসা সেবা প্রদান এবং সর্বোপরি তাদের স্বাবলম্বী করাই ছিল তার মূল লক্ষ্য। আব্দুল করীম সাহেবের বড় ছেলে জামান আব্দুল মজিদ সাহেবও ঐ প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমানে পরিচালনা পরষদের সভাপতি। এই প্রতিষ্ঠান টি প্রতিষ্ঠার পিছনের কহীনিটি ছিল অত্যন্ত বেদনদায়ক এবং করুন। আব্দুল মজিদ সাহেবের একমাত্র কন্যর নাম ছিল বেবি বালি। সে ছিল প্রতিবন্ধী ও অসুস্থ। আদরের ধন বেবিকে খুব ভালবাসতেন আব্দুল মজিদ সাহেব। তাকে সুস্থ করবার জন্য দেশ-বিদেশে বহু চিকিৎসা করিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্য এতটাই বিমুখ ছিল তিনি আদরের মেয়েকে বাঁচাতে পারেন ন। এই ঘটনা তার মনের গভীরে প্রচন্ড ভাবে রেখাপাত করে যায়। তিনি ভিতর থেকে একটা তাগিদ অনুভব করতে থাকেন প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য কিছু একটা করার। সেই তিগিদ থেকেই তিনি সাধনপুর পঙ্গু শিশু নিকেতনটি প্রতিষ্ঠায় অগ্রনী ভূমিকা রাখেন।।

 

অবস্থান: বরনাই নদীর তীরে এক অসাধারণ পরিবেশে সাধনপুর পঙ্গু শিশু নিকেতনের অবস্থান। এই প্রতিষ্ঠানটির পূর্বে বিদিরপুর খাল, পশ্চিমে পাকা রাস্তা, উত্তরে বরনাই নদীএবং দক্ষিনে মাঠ। সাধনপুর বাজার থেকে পঙ্গু শিশুনিকেতনের দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার।

 

আয়তন: প্রথম অবস্থায় খুব ছোট পরিসরে সাধনপুর পঙ্গু শিশু নিকেতন যাত্রা শুরু করেছিল। ধীরে ধীরে এর পরিধি বাড়তে থাকে। বর্তমানে এর আয়তন কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আয়তন বাড়তে বাড়তে প্রায় ত্রিশ একরে গিয়ে পৌঁছেছে।

 

সুযোগ সুবিধা: এই প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে বিশাল এক ক্যাম্পাস। অনেক গুলো প্রতিষ্ঠান এখন এর অন্তর্ভূক্ত। এর মধ্যে রষেছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি উচ্চ বিদ্যালয়, একটি কলেজ, একটি সমন্নিত অন্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, একটি পাঠাগার এবংএকটি শিশুপার্ক। স্বাস্থ্য সেবার কথাও এখানে ভাবা হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে এখানে নির্মান করা হয়েছে একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও একটি ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা ব্যবস্থা কেন্দ্র। যেখান থেকে স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে উপকৃত হচ্ছে। ঐখানে বসবাসরত প্রতিবন্ধী শিশুরা। আর এভাবে প্রতিবন্ধী শিশুরা স্বাস্থ্য সেবা পাচ্ছে। গরীব পঙ্গু শিশুরা থাকা খাওয়ার সম্পূর্ণ সুবিধা পেয়ে থাকে। পঙ্গু শিশুদেরকে কারিগরি প্রশিক্ষণও দেওয়া হয় যাতে তারা স্বাবলম্বী হতে পারে।  এভাবে এই প্রতিষ্ঠান তাদের পূর্নবাসনের ব্যবস্থা করেছে যা সত্যি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

কীভাবে যাওয়া যায়: বাংলদেশের যেকোন প্রান্ত থেকে সড়ক পথে, রেল পথে ও আকাশ পথে রাজশাহী যাওয়া যায়। সাধনপুর পঙ্গু শিশু নিকেতনটি রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। রাজশাহী থেকে বাস যোগে প্রথমে পুঠিয়া বাসষ্ট্যান্ড যেতে হবে। পুঠিয়া থেকে প্রথমে বাসে, পরে ভ্যান বা রিক্সায় চড়ে সাধনপুর পঙ্গু শিশু নিকেতন যাওয়া যায়।

 

পৃথীবি প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। তাই আমাদেরও নিজেদেরকে পরিবর্তন করতে হবে। এই সব পঙ্গু-দুস্থ মানুষের দিকে বাড়িয়ে দিতে হবে সাহায্যের হাত। তাদেরকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কাজ করতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে আব্দুল করিম সাহেবের প্রতিষ্ঠিত সাধনপুর পঙ্গু শিশু নিকেতন-ই হবে আমাদের আদর্শ।